ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ , ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার নতুন উদ্যোগ

অনলাইন ডেস্ক
৫২ মিনিট আগে
ভারত মহাসাগরে চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার নতুন উদ্যোগ
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশ দুটি। এ লক্ষ্যে পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোয়ি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি ও ক্যানবেরার নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তার মধ্যে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে দুই দেশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-অস্ট্রেলিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সূচনা ২০০০ সালের দিকে। ওই বছর অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের ভারত সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৬ সালে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে দেশ দুটি। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে কোয়াড সংলাপ এবং মালাবার নৌমহড়ায় অংশ নেয় ভারত ও অস্ট্রেলিয়া।

চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও গভীর হয়েছে। ২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর চীনকে ঘিরে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। একই সময়ে চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যিক বিরোধ এবং বেইজিংয়ের বিভিন্ন বিধিনিষেধ ক্যানবেরার নিরাপত্তা ভাবনায় প্রভাব ফেলে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে দুই দেশ ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ প্রতিষ্ঠা করে। একই বছর সামুদ্রিক ও সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা, পারস্পরিক রসদ সহায়তা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালু হয়।

লোয়ি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সামরিক বাহিনী ১৪টি দ্বিপক্ষীয় এবং ৬৪টি ত্রিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। এসব মহড়ায় সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন মোকাবিলা, সমুদ্রে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ এবং বহুমাত্রিক সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে গিয়ে কিছু বাধার মুখেও পড়তে হচ্ছে দেশ দুটিকে। সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার অসামঞ্জস্য, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র রপ্তানি নিয়ন্ত্রণনীতি এবং সামরিক সদস্যদের দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুবিধার অভাব যৌথ কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে।

এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণের সুপারিশ করেছে প্রতিবেদনটি। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সেবা সরবরাহে সমঝোতা স্মারক দ্রুত চূড়ান্ত করা, নিরাপদ সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুই দেশের দ্বীপাঞ্চলে পি-৮ নজরদারি উড়োজাহাজের পারস্পরিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ এবং যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন শুরু করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

যৌথ উৎপাদনের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা, সাবমেরিন শনাক্তকরণে ব্যবহৃত সোনোবয়, সাঁজোয়া যান, চালকবিহীন ডুবোযান এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত মহাসাগরের দুই প্রান্তে অবস্থানকারী ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে পারলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নজরদারি ও নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।

সব মিলিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া এখন শুধু সামরিক মহড়ার মধ্যে সহযোগিতা সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। বরং নিরাপদ যোগাযোগ, সামরিক সরঞ্জাম বিনিময় এবং যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে দেশ দুটি।

সূত্র: লোয়ি ইনস্টিটিউট





কমেন্ট বক্স